gallery

July 18, 2026

মেধাতালিকা

ডঃ বিপ্লব পাল

অনিশ্চিত সময়ের গল্প — প্রথম খণ্ড লেখকের কথা — “নরনারীর মনের অন্ধকারে যে প্রশ্নগুলি প্রতিদিন জাগে, এই গল্পগুলি তাদের ভাষা খোঁজে।”

রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিটে অরিন্দম বুঝল, মানুষের জীবনে কিছু শব্দ থাকে যেগুলো শব্দ নয়—রায়। কম্পিউটারের পর্দা য় লেখা ছিল, Not Qualified। মাত্র দুটি ইংরেজি শব্দ। অথচ তার ভেতরে যেন তেত্রিশ বছরের একটি মানুষকে দাঁ ড় করিয়ে বিচারক বললেন, “তোমার আর কোনো আপিল নেই।”
এটি তার পঞ্চাশতম চাকরির পরীক্ষা।
ড্রয়ারে পঞ্চাশ অ্যাডমিট কার্ড—রেল, ব্যাংক, স্কুল সার্ভিস, ক্লার্কশিপ, গ্রুপ-সি, গ্রুপ- ডি। দেশের অসংখ্য দপ্তর তার নাম, বাবার নাম, জন্মতারিখ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা জেনেছে; শুধু তাকে কাজ দেয়নি। রাষ্ট্র তার সম্পর্কে এত কিছু জানে, অথচ রাষ্ট্রের কাছে সে যেন জন্মায়ইনি।

দেয়ালে ঝুলছিল স্কুলজীবনের সোনালি মেডেল। সবুজ-সাদা ফিতেটা ধুলোয় বিবর্ণ। মাধ্যমিকে স্কুলে প্রথম হওয়ার দিন হেডমাস্টার তার কাঁ ধে হাত রেখে বলেছিলেন, “এই ছেলে একদিন সরকারি বড় অফিসার হবে।” মাঠভরা মানুষ হাততালি দিয়েছিল। বাবা হরিপদবাবু কেঁদে ফেলেছিলেন। সেদিন মিষ্টির দোকানে বলেছিলেন, “ভালোটা দিন, আমার ছেলে স্কুলে ফার্স্ট হয়েছে।”
সেই দিন থেকেই অরিন্দম আর ছেলে ছিল না; সে হয়ে গিয়েছিল ভবিষ্যদ্বাণী। পাড়ার কাকুরা বলতেন, “তোর তো সরকারি চাকরি বাঁ ধা।” মাসিরা বলতেন, “বাবা- মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবি।” শিক্ষক বলতেন, “সায়েন্স নিয়ে পড়, তোর মেধা নষ্ট করিস না।” কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেনি সে কী করতে চায়। সবাই এমনভাবে তার ভবিষ্যৎ জানত, যেন ঈশ্বর ভুল করে আগামী দিনের সরকারি গেজেটটি তাদের হাতে দিয়েছেন।
অরিন্দমও বিশ্বাস করেছিল। কারণ শিশুরা প্রথমে পৃথিবীকে নয়, বড়দের বিশ্বাস করে।

সে ফিজিক্সে বিএসসি, এমএসসি, তারপর বিএড করল। প্রতিটি ডিগ্রির শেষে বাবা বলতেন, “এবার আর আটকাবে না।”
প্রতিটি ব্যর্থতার পর বলতেন, “আর একবার চেষ্টা কর।” কথাটা প্রথমে সান্ত্বনা ছিল; বছর যেতে যেতে আদেশ, পরে অভিশাপ।

তার সহপাঠী বাপ্পা একাদশ-দ্বাদশে শেষ বেঞ্চে বসত, অঙ্ক না পারলে অরিন্দমের খাতা দেখার চেষ্টা করত। অরিন্দম মনে মনে ভাবত, এদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সেই বাপ্পা কলেজে ভর্তি না হয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সেলসে ঢুকেছিল আট হাজার টাকায়। রোদে ঘুরেছে, গ্রাহকের গাল খেয়েছে, টার্গেট না মেলায় অপমানিত হয়েছে; তবু পরের মাসে আবার বেরিয়েছে।

এখন বাপ্পা আঞ্চলিক সেলস ম্যানেজার। মাসে এক লাখ কুড়ি হাজার পায়, স্ত্রী আছে, পাঁ চ বছরের মেয়ে আছে, গাড়ির পেছনে লেখা—“পিহু অন বোর্ড।”

কুণাল, যে উচ্চমাধ্যমিকে নকল করে কোনোরকমে পাশ করেছিল, এখন একটি উৎপাদন সংস্থার সাপ্লাই চেইন সামলায়। রাকেশ পুণেতে যন্ত্রাংশের সেলসে। তারা কেউ জিনিয়াস নয়, কিন্তু তাদের জীবন চলেছে। অরিন্দমের জীবন শুধু প্রস্তুতি নিয়েছে।

তেত্রিশ বছর বয়সে স্কুলের পুনর্মিলনীতে বাপ্পা তাকে জড়িয়ে বলেছিল, “গুরু, এখনও পড়ছিস? তুই তো আমাদের সবার সেরা ছিলি!”
কথাটিতে শ্রদ্ধা ছিল, তবু অরিন্দমের কানে তা করুণার মতো শোনাল।
বাপ্পা নিজের অফিসে তার একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে। মানবসম্পদ বিভাগের মেয়েটি সিভির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “গত আট-নয় বছর আপনি কী করেছেন?”
“প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি।”
“কোনো চাকরি?”
“না।”
“এক্সেল, সিআরএম, ডেটা রিপোর্টিং ?”
অরিন্দম চুপ।
সে বলতে চেয়েছিল, আমি অনিশ্চয়তা, অপমান, একই বই দশবার পড়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করা, বাবার পেনশনের টাকায় ফর্ম ভরার লজ্জা—সব হ্যান্ডেল করেছি। এগুলো কি অভিজ্ঞতা নয়?
কিন্তু বলেছিল, “শিখে নেব।”
মেয়েটি ভদ্র। হাসিতে নিষ্ঠুরতা ছিল না, আর তাই তা আরও অসহ্য লেগেছিল।

ফেরার সময় বাপ্পা বলে, “শুরুতে মাইনে কম হবে, কিন্তু ঢুকে পড়। দু-তিন বছরে উঠে যাবি।”
অরিন্দমের ভেতরের পুরোনো মেধাবী ছেলেটি ফিসফিস করে, তুই বাপ্পার নিচে কাজ করবি?
সেদিন সে বোঝেনি, অহংকারও কখনো আত্মবিনাশের ধীর প্রস্তুতি।
বাড়িতে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইন্টারভিউ কেমন হল?”
অরিন্দম বলেছিল, “ওসব আমার জন্য নয়। খুব কম মাইনে।”
হরিপদবাবুর মুখ উজ্জ্বল। “ঠিকই করেছিস। তুই সরকারি চাকরিই পাবি।”
দুজনেই মিথ্যে বলেছিল—একজন ছেলেকে বাঁ চাতে, অন্যজন নিজের অহংকার বাঁ চাতে।

পড়াতে আসা ছাত্র মিতুল একদিন বলেছিল, “স্যার, আমার পড়াশোনা ভালো লাগে না। আমি মোবাইল সারাতে শিখতে চাই।”
অরিন্দম কঠোর গলায় বলেছিল, “পড়াশোনা না করলে মানুষ হবি কী করে?”
ছেলেটি জিজ্ঞেস করেছিল, “মানুষ হওয়া আর চাকরি পাওয়া কি একই জিনিস, স্যার?”
অরিন্দম উত্তর দিতে পারেনি। হঠাৎ মনে হয়েছিল, সে মিতুলকে নয়, নিজের দশ বছরের মুখটাকে বকছিল।

পঞ্চাশতম ফলাফলের রাতে ঘরে শুধু কম্পিউটারের নীল আলো। অরিন্দমের নিজের ভেতরে আদালত। বিচারকের আসনে তার কিশোর বয়স—গলায় মেডেল, চোখে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সাক্ষীর কাঠগড়ায় বাবা, পাড়া, কোচিং সেন্টারের পোস্টার, চাকরির বিজ্ঞপ্তি, কাট-অফ নম্বর।
অরিন্দম বলল, “আমি চেষ্টা করেছি।”
বিচারক জিজ্ঞেস করল, “ফল?”
“পাইনি।”
“তাহলে চেষ্টা প্রমাণ নয়।”
“আমি পড়েছি।”
“কী শিখেছ?”
দীর্ঘ নীরবতার পর অরিন্দম বলল, “শিখেছি, একটি সমাজ শিশুকে বলতে পারে— তুমি মেধাবী, তাই তোমার জীবন নিশ্চিত। তারপর সেই নিশ্চয়তার পেছনে সে তার যৌবন বন্ধক রাখে। ডিগ্রি জ্ঞান দিতে পারে, কাজের নিশ্চয়তা দেয় না। অপেক্ষাও একধরনের নেশা।”
বিচারক এবার তারই কণ্ঠে বলল, “তবে উঠে দাঁড়াও।”
অরিন্দম ফিসফিস করল, “এখন খুব দেরি।”
সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল। কারণ হতাশা যখন বলে “দেরি হয়ে গেছে”, কথাটা সত্যের মতো শোনায়।

পাশের ঘর থেকে বাবার কাশি। হরিপদবাবু ভাবছিলেন, ছেলে পড়ছে। তিনি জানতেন না, তার প্রতিটি কাশি অরিন্দমের কাছে ঋণের কিস্তির মতো পৌঁছাচ্ছে।
অরিন্দম একটি সাদা কাগজ টেনে নিল। অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিল—
শিক্ষাব্যবস্থা, নিয়োগ, বয়স, অপমান, নষ্ট বছর। শেষ পর্যন্ত র্য লিখল মাত্র দুটি শব্দ—
“সরি বাবা।”
তার পাশে মেডেলটি রাখল।
শেষ মুহূর্তে ফোন একবার জ্বলে উঠেছিল। মিতুলের বার্তা —
“স্যার, আমি পলিটেকনিকে চান্স পেয়েছি। আপনি রাগ করবেন না তো?”
অরিন্দম বার্তাটি আর পড়েনি।

পরদিন সকাল সাতটায় হরিপদবাবু দরজায় চা নিয়ে ডাকলেন, “অরি, ওঠ। আজ তো লাইব্রেরি যাবি।”
ঘর কোনো উত্তর দিল না।
তারপর যে কোলাহল শুরু হল, তার কেন্দ্রে ছিল এক অতিকায় নীরবতা। প্রতিবেশী, পুলিশ, সাংবাদিক এল। দুপুরের মধ্যে শিরোনাম তৈরি—
“পঞ্চাশবার চাকরির পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে যুবকের আত্মহত্যা।”

একটি মানুষের তেত্রিশ বছরকে বারোটি শব্দে প্রকাশ করা।

কেউ বলল সে দুর্বল; কেউ বলল সিস্টেম তাকে মেরেছে; কেউ বলল বাবা-মায়ের চাপ। কোচিং সেন্টারটি সন্ধ্যায় পোস্ট দিল—“ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়।” নিচে তাদের নতুন ব্যাচের ফোন নম্বর।
শুধু হরিপদবাবু কিছু বললেন না।
তিন দিন পরে তিনি ছেলের সার্টিফিকেটগুলো মেঝেতে সাজালেন—প্রথম বিভাগ, স্টার মার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, প্রশিক্ষণের সনদ। কাগজের পাহাড়ের মাঝে বসে জিজ্ঞেস করলেন,
“এতগুলো প্রথম শ্রেণি মিলে আমার ছেলেকে দ্বিতীয় জীবন দিতে পারল না কেন?” কেউ উত্তর দিল না।

কয়েক সপ্তাহ পর তিনি অরিন্দমের স্কুলে গেলেন। প্রধান শিক্ষকের ঘরের বাইরে এখনও পুরোনো মেধাতালিকা টাঙানো। সবার ওপরে—
“অরিন্দম পাল—আমাদের গর্ব।”
হরিপদবাবু নামটির দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে ধুলো ধরা মেডেলটি বের করে টেবিলে রাখলেন।
“এটা রেখে দিন।”
প্রধান শিক্ষক বিস্মিত হলেন। “কেন?”
“পরেরবার কোনো ছেলেকে পুরস্কার দেওয়ার সময় শুধু বলবেন না, ‘তুই বড় চাকরি পাবি।’ বলবেন, চাকরি না পেলেও তার জীবন ছোট হয়ে যায় না। মেধা কোনো নিয়োগপত্র নয়। পথ বদলানো পরাজয় নয়।”

বাইরে ছুটির ঘণ্টা বেজেছে। ছেলেমেয়েরা মাঠে বেরিয়ে আসছে। হরিপদবাবু তাদের মুখে অরিন্দমকে খুঁজলেন—কোথাও হয়তো আবার একটি ভালো ছেলে দাঁ ড়িয়ে আছে, যার কাঁ ধে সবাই মিলে ভবিষ্যতের এমন ভার চাপিয়ে দিচ্ছে, যা বহন করার জন্য কোনো শিশুর জন্ম হয় না।

মেধাতালিকায় অরিন্দমের নাম এখনও প্রথমে রয়ে গেল।
শুধু জীবনের হাজিরা খাতায় তার পাশে লেখা হল— অনুপস্থিত।

লেখকের ঘোষণা: এই সংকলনের গল্পগুলি সাহিত্যকর্ম। কিছু গল্প বাস্তব সংবাদ বা সামাজিক ঘটনার প্রেরণা বহন করলেও চরিত্র, সংলাপ, মানসিক দ্বন্দ্ব ও কাহিনি সাহিত্যিক নির্মাণ। প্রতিটি গল্পের নিজস্ব ঘোষণা বা উৎস-নোট যেখানে আছে, তা মূল পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী রাখা হয়েছে।

এই গল্পগুলিতে আমি নরনারীর মনের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছি—সেই অন্ধকার পাতালে, যেখানে প্রেমের সঙ্গে মালিকানা, নিরাপত্তার সঙ্গে বন্দিত্ব, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অপরাধবোধ এবং যত্নের সঙ্গে অবহেলা একই ঘরে বাস করে। প্রতিটি মানুষই প্রতিদিন এই অনুভূতিগুলিকে ছুঁয়ে যায়; কিন্তু প্রকাশ করতে গেলে ভাষা হারিয়ে ফেলে।

আমি নারীকে দেবী বা দোষী, পুরুষকে অত্যাচারী বা নির্দো ষ—কোনও সহজ নামের মধ্যে আটকে রাখতে চাইনি। সম্পর্কের ভিতরে আমরা একই সঙ্গে আহত এবং আঘাতকারী, প্রেমিক এবং বিচারক, আশ্রয়দাতা এবং কারারক্ষী হয়ে উঠি। এই গল্পগুলি সেই জটিল মানুষের গল্প—যে মানুষ অন্যকে বোঝার আগে নিজেকেই পুরোপুরি বোঝে না।

পাঠক যদি কোনও গল্প পড়ে নিজের জীবনের একটি নীরব প্রশ্নের ভাষা খুঁজে পান, তবে এই দীর্ঘ অর্ঘ পেক্ষার কিছুটা অর্থ থাকবে।

পাঠক-সতর্কীকরণ: কয়েকটি গল্পে আত্মহত্যা, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, মৃত্যু , অপরাধ ও সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রসঙ্গ রয়েছে। সংবেদনশীল পাঠক নিজের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী পড়বেন।

Leave a comment