July 4, 2026
ডঃ বিপ্লব পাল
অনিশ্চিত সময়ের গল্প — প্রথম খণ্ড লেখকের কথা — “নরনারীর মনের অন্ধকারে যে প্রশ্নগুলি প্রতিদিন জাগে, এই গল্পগুলি তাদের ভাষা খোঁজে।”
রাত সাড়ে ন’টার দিকে শেষ লোকাল ট্রেনটা হলুদ আলোয় ভরা জানালাগুলো টেনে খড়্গপুর স্টেশন ছেড়ে গেলে, নন্দিতা সেন স্টেশনের কাছের একটি ছোট লজে ঢুকল। রেজিস্টারে নিজের নাম লিখল না। লিখল—মধুমিতা পাল। তার বয়স আটত্রিশ। মেয়েদের ইতিহাস পড়ায়। ছাত্রীদের সে শেখায়—সাম্রাজ্য ভাঙে, রাজা বদলায়, মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়। অথচ নিজের জীবনের সীমানা সে তেরো বছরেও এক ইঞ্চি সরাতে পারেনি।
নন্দিতার স্বামী দেবাশিস খারাপ মানুষ নয়। এই কথাটাই তার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। দেবাশিস কখনও তাকে মারে না, গালাগাল দেয় না, টাকা লুকিয়ে রাখে না। বাজার করে, ছেলের স্কুলের ফি দেয়, মায়ের ওষুধ আনে, রাতে দরজা বন্ধ হয়েছে কিনা দেখে। খাওয়ার টেবিলে কলের মিস্ত্রি, বিদ্যুতের বিল, স্কুলের পরীক্ষা আর ভবিষ্যতের সঞ্চয় নিয়ে কথা বলে। তারপর একজন সৎ, ক্লান্ত মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। তার পাশে শুয়ে নন্দিতা কখনও কখনও ভোর পর্যন্ত জেগে থাকে। একসময় সে বুঝেছিল, ভালো মানুষও কারাগার তৈরি করতে পারে—ইট দিয়ে নয়, কর্তব্য দিয়ে। দেবাশিসের বিশ্বাস এত নিখুঁত যে নন্দিতার প্রতিটি গোপন চিন্তা তার কাছে চুরির মতো মনে হতো। সে স্বামীকে ঘৃণা করত না; বরং তার শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের অশান্তির জন্য লজ্জা পেত।
অরুণের সঙ্গে তার পরিচয় তিন বছর আগে, শিক্ষকদের কর্মশালায়। অরুণ কথা
শোনার সময় এমনভাবে তাকাত, যেন নন্দিতার প্রতিটি বাক্য ডুবে যাওয়ার আগে সে
টেনে তুলছে। তার সামনে নন্দিতা আবার হাসতে পারত, তর্ক করতে পারত, নিষ্ঠুর হতে
পারত, এমনকি নিজেকে তরুণীও মনে হতো।
অরুণ বলেছিল, “এই মৃত শহরে তুমিই একমাত্র জীবিত মানুষ।”
ছ’মাস পর্যন্ত নন্দিতা কথাটিকে মুক্তি ভেবেছিল। তারপর একদিন অরুণ জিজ্ঞেস
করল, “কবে দেবাশিসকে ছেড়ে আসবে?”
সেদিন সে প্রথম বুঝল, দুই পুরুষের ইচ্ছা আলাদা হলেও তাদের দাবি একই—
নন্দিতাকে সহজ হতে হবে। একজনের কাছে সে হবে শান্ত স্ত্রী, অন্যজনের কাছে সাহসী প্রেমিকা। কিন্তু দুজনের কেউই এমন একজন নারীকে চায় না, যে নিজেও জানে না সে
কী।
সেই রাতে লজের সতেরো নম্বর ঘরে অরুণ অপেক্ষা করছে। টেবিলে সস্তা হুইস্কির
বোতল, দুটি গ্লাস। জানালায় বৃষ্টি পড়ছিল। অরুণের মুখে অপমানিত অভিব্যক্তি, যা
দীর্ঘদির্ঘ ন অপেক্ষা করা প্রেমিকেরা নিজেরাই তৈরি করে নেয়।
নন্দিতা ঘরে ঢুকতেই সে বলল,
“তুমি বলেছিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছ।”
“নিয়েছি।”
“আমার সঙ্গে চলে যাবে?”
“আমি বলেছিলাম, এখানে আসব।”
অরুণ হাসল। হাসির ভেতরে ভয়।
“তুমি সব কথা জটিল করে দাও। একটা সরল প্রশ্নকে গোলকধাঁধা বানাও।”
“আর তুমি আমার জীবনকে ট্রেনের টাইমটেবিল ভাবো। কখন ছাড়ব, কোথায় উঠব,
কার সঙ্গে যাব—সব ঠিক করা।”
“তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
“হ্যাঁ ।”
“দেবাশিসকে?”
নন্দিতা জানালার দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ ।”
অরুণ গ্লাসটা টেবিলে এত জোরে নামাল যে কাঁ চে চিড় ধরল।
“তাহলে তুমি কাউকেই ভালোবাসো না।”
কথাটা নন্দিতার শরীরের ভেতর ঠান্ডা ছুরির মতো ঢুকে গেল। হয়তো সত্যিই তাই।
হয়তো তার ভালোবাসা আসলে ভালোবাসা নয়—শুধু এক জায়গা থেকে আরেক
জায়গায় পালানোর ইচ্ছা।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি চিন্তা এল। কেন ভালোবাসাকে সবাই একটিমাত্র পরিষ্কার
শিখা বলে ধরে নেয়? মানুষের ভেতর কি একসঙ্গে বহু আলো জ্বলে না? একটি আলো
ঘরকে উষ্ণ করে, আরেকটি আলো গোপন সিঁড়ি দেখায়। একটির জন্য অন্যটি
নেভাতেই হবে কেন?
অরুণ বলল, “তুমি সব চাও।”
“না। আমি শুধু জানতে চাই, আমাকে যা দেওয়া হয়, তার প্রতিটির দাম কেন আমার
আরেকটি অংশের মৃত্যু ?”
“বড় বড় কথা! তুমি সম্মানের জন্য স্বামী চাও, উত্তেজনার জন্য প্রেমিক।”
নন্দিতা হেসে ফেলল। হাসিটা তার নিজের কাছেই কুৎসিত শোনাচ্ছে।
“আর তুমি কী চাও? আমি যেন সংসার ছেড়ে তোমার কাছে আসি, যাতে তোমার
প্রেমটা মহৎ মনে হয়। দেবাশিস চায় এমন স্ত্রী, যার কোনো অতল নেই। তুমি চাও এমন
অতল, যে সকালে চা বানাবে।”
অরুণ চুপ করে গেল। মুহূর্তের জন্য নন্দিতা প্রেমিককে নয়, একটি ভীত ছেলে
দেখতে পাচ্ছে। তার ভেতর মায়া জেগে উঠল। আর মায়ার মতো বিপজ্জনক অনুভূতি
খুব কম আছে—কারণ তাকে প্রায়ই আত্মসমর্পণ বলে ভুল হয়।
বাইরে কোনো কুলি চেঁচাচ্ছে। পাশের ঘরে একটি শিশু ঘুমের মধ্যে কাঁ দল। লজ
শহরের ওপর ঝুলে থাকা এমন এক স্বীকারোক্তি, যা কোনো পুরোহিত শুনতে রাজি নয়।
নন্দিতা ব্যাগ থেকে দুটি খাম বের করল। একটিতে দেবাশিসের নাম, অন্যটিতে
অরুণের।
অরুণ জিজ্ঞেস করল, “ওগুলো কী?”
“দুটি মিথ্যে।”
সে দুটো চিঠিই ছিঁড়ে ফেলল।
দেবাশিসকে লেখা চিঠিতে সে লিখেছিল—এই বিয়ে তাকে শ্বাস নিতে দেয়নি।
অরুণকে লেখা চিঠিতে লিখেছিল—এই প্রেম তাকে প্রতারণা করেছে। লেখার সময়
দুটো কথাই সত্যি বলে মনে হয়েছিল, কারণ কাউকে দোষ দিলে কষ্টের একটা পরিষ্কার
আকার পাওয়া যায়।
কিন্তু সতেরো নম্বর ঘরে বসে নন্দিতা হঠাৎ বুঝল, তার ক্ষুধা কোনো পুরুষ তৈরি
করেনি। পুরুষেরা শুধু সেই ক্ষুধার আলাদা আলাদা নাম দিয়েছে।
শৈশব থেকে তাকে শেখানো হয়েছে, ভালো মেয়েরা জীবনের কোনো এক জায়গায়
পৌঁছে যায়—বিয়েতে, মাতৃত্বে, সমঝোতায়। পৌঁছে গেলে আর প্রশ্ন করতে নেই। ভালো
নারী মানে যে স্টেশনে নেমে গেছে এবং আর কোনো ট্রেনের শব্দ শোনে না।
কিন্তু নন্দিতা জীবনের প্রতিটি নির্ধারিত স্টেশনে পৌঁছে ও দূরে আরেকটি ট্রেনের বাঁশি
শুনেছে।
সমাজ সেই অস্থিরতাকে লোভ বলে। ধর্ম বলে পাপ। উপন্যাস বলে প্রেম। পুরুষ
বলে বিশ্বাসঘাতকতা। নন্দিতা নিজে তার কোনো নাম খুঁজে পায়নি। শুধু মনে হয়েছে—
এর নাম হয়তো জীবন।
অরুণ চিড় ধরা গ্লাস দুটিতে হুইস্কি ঢালল।
“কাল তুমি ওর কাছে ফিরে যাবে,” সে শান্ত গলায় বলল। “এক সপ্তাহ পর আমাকে
লিখবে। এক মাস পর আমাকে ঘৃণা করবে। তারপর ওকে ঘৃণা করবে। তুমি কোনো
কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারো না।”
নন্দিতা গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হয়তো পারি না। কিন্তু অসন্তোষকে শুধু নারীর রোগ ভাবো কেন? তুমি তোমার
চাকরিতে অসন্তুষ্ট, বেতনে অসন্তুষ্ট, এই শহরে অসন্তুষ্ট, সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট,
এমনকি আয়নায় নিজের মুখ দেখেও অসন্তুষ্ট। তোমার অসন্তোষের নাম উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
আমারটার নাম চরিত্রহীনতা।”
অরুণ গ্লাস তুলেও নামিয়ে রাখল।
“তাহলে তুমি কী খুঁজছ?”
প্রশ্নটি সত্যি। তাই অভিযোগের চেয়েও বেশি ভয় পেল নন্দিতা।
অনেকক্ষণ পরে সে বলল,
“একদিন ঘুম থেকে উঠে যেন মনে না হয়, আমি কারও প্রশ্নের উত্তর।”
তারপর কী ঘটেছিল, তা নিয়ে কোনোদিন একমত হওয়া যায়নি।
লজের ম্যানেজার বলেছিল, সে ঝগড়ার শব্দ শুনেছে। বেয়ারা বলেছিল, কোনো শব্দই হয়নি। একটি গ্লাসে ঘুমের ওষুধের চিহ্ন ছিল, অন্যটিতে ছিল না। ভোরে নন্দিতাকে বিছানার পাশে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার একটি হাত খোলা ছিল, যেন শেষ মুহূর্তে সে অদৃশ্য কিছু ছেড়ে দিয়েছে।
অরুণকে বাথরুমের কাছে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে
সে বেঁচে যায়। সে নন্দিতাকে বাঁ চাতে চেয়েছিল, তার সঙ্গে মরতে চেয়েছিল, নাকি শুধু
পালাতে চেয়েছিল—কেউ জানতে পারেনি।
তবে দুপুরের মধ্যেই শহর তদন্ত শেষ করে ফেলে।
স্কুলের গেটে অভিভাবকেরা বলেছিল, বেশি পড়াশোনা করলে মেয়েদের মাথা খারাপ হয়। কেউ বলল, “স্বামী থাকতে লজে!” কেউ বলল, “এমন মেয়েদের পরিণতি এটাই।” খবরের কাগজে লেখা হলো—রহস্যমৃত্যু , অবৈধ সম্পর্ক, চাঞ্চল্য।
দেবাশিস সিলিং ফ্যানের নিচে বসে বারবার বলল,
“আমি তো ওকে সব দিয়েছিলাম।”
কথাটা সে এমনভাবে বলছিল, যেন ঈশ্বরের আদালতে প্রমাণ জমা দিচ্ছে।
অরুণ সুস্থ হওয়ার পর শুধু বলল,
“ও কোনোদিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।”
কিন্তু নন্দিতার শ্রেণিকক্ষে এক ছাত্রী ব্ল্যাকবোর্ডের নিচে চক দিয়ে লেখা একটি বাক্য
খুঁজে পেল। পরিষ্কার করার লোকের কাপড় সেখানে পৌঁছায়নি।
লেখা ছিল—
সব রাস্তা কি শেষ পর্যন্ত কোনো পুরুষের বাড়িতেই গিয়ে থামবে?
প্রধান শিক্ষিকা সঙ্গে সঙ্গে বাক্যটি মুছে দিলেন।
বহু বছর পরেও শহরের মানুষ সেই কেলেঙ্কারির কথা মনে রেখেছিল। কিন্তু নন্দিতা
কী পড়াত, কীভাবে হাসত, কিংবা কোন প্রশ্নে ক্লাস থামিয়ে দীর্ঘক্ষণ জানালার বাইরে
তাকিয়ে থাকত—সেসব কেউ মনে রাখেনি।
তারা বলত, নন্দিতা প্রেম আর বিয়ের মাঝখানে দাঁ ড়িয়ে মরেছে। নিজের
সিদ্ধান্তহীনতার শাস্তি পেয়েছে। ব্যাখ্যাটি খুব সন্তোষজনক। আর যে ব্যাখ্যা সবাইকে
এত দ্রুত সন্তুষ্ট করে, তা প্রায়ই সত্যি হয় না।
হয়তো নন্দিতা দুই পুরুষকে চায়নি। হয়তো সে এমন একটি জীবন চেয়েছিল, যেখানে
ভালোবাসা মানেই বন্দিত্ব নয়, বিয়ে মানেই ঘুমিয়ে পড়া নয়, আর একজন নারীর
অতৃপ্তিকে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় না।
সতেরো নম্বর ঘরে নতুন রং করা হলো। চিড় ধরা গ্লাস দুটি ফেলে দেওয়া হলো। বৃষ্টির
মধ্যে ট্রেন আগের মতোই খড়্গপুর ছেড়ে যেতে থাকল।
আর যাত্রা ও গন্তব্যের মাঝের অন্ধকারে নন্দিতা রয়ে গেল—নির্দোষ নয়, দোষীও
নয়; বিশ্বস্ত নয়, অবিশ্বস্তও নয়; শুধু অসম্পূর্ণ।
পুরুষের অসম্পূর্ণতাকে সমাজ ভবিষ্যৎ বলে।
নারীর অসম্পূর্ণতাকে বলে বিপদ।
লেখকের ঘোষণা: এই সংকলনের গল্পগুলি সাহিত্যকর্ম। কিছু গল্প বাস্তব সংবাদ বা সামাজিক ঘটনার প্রেরণা বহন করলেও চরিত্র, সংলাপ, মানসিক দ্বন্দ্ব ও কাহিনি সাহিত্যিক নির্মাণ। প্রতিটি গল্পের নিজস্ব ঘোষণা বা উৎস-নোট যেখানে আছে, তা মূল পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী রাখা হয়েছে।
এই গল্পগুলিতে আমি নরনারীর মনের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছি—সেই অন্ধকার পাতালে, যেখানে প্রেমের সঙ্গে মালিকানা, নিরাপত্তার সঙ্গে বন্দিত্ব, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অপরাধবোধ এবং যত্নের সঙ্গে অবহেলা একই ঘরে বাস করে। প্রতিটি মানুষই প্রতিদিন এই অনুভূতিগুলিকে ছুঁয়ে যায়; কিন্তু প্রকাশ করতে গেলে ভাষা হারিয়ে ফেলে।
আমি নারীকে দেবী বা দোষী, পুরুষকে অত্যাচারী বা নির্দো ষ—কোনও সহজ নামের মধ্যে আটকে রাখতে চাইনি। সম্পর্কের ভিতরে আমরা একই সঙ্গে আহত এবং আঘাতকারী, প্রেমিক এবং বিচারক, আশ্রয়দাতা এবং কারারক্ষী হয়ে উঠি। এই গল্পগুলি সেই জটিল মানুষের গল্প—যে মানুষ অন্যকে বোঝার আগে নিজেকেই পুরোপুরি বোঝে না।
পাঠক যদি কোনও গল্প পড়ে নিজের জীবনের একটি নীরব প্রশ্নের ভাষা খুঁজে পান, তবে এই দীর্ঘ অর্ঘ পেক্ষার কিছুটা অর্থ থাকবে।
পাঠক-সতর্কীকরণ: কয়েকটি গল্পে আত্মহত্যা, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, মৃত্যু , অপরাধ ও সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রসঙ্গ রয়েছে। সংবেদনশীল পাঠক নিজের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী পড়বেন।