July 25, 2026
ডঃ বিপ্লব পাল
অনিশ্চিত সময়ের গল্প — প্রথম খণ্ড লেখকের কথা — “নরনারীর মনের অন্ধকারে যে প্রশ্নগুলি প্রতিদিন জাগে, এই গল্পগুলি তাদের ভাষা খোঁজে।”
অরিন্দমের বয়স তিরিশ। গত পাঁ চ বছরে সে রাজ্য ও কেন্দ্র মিলিয়ে এত সরকারি চাকরির ফর্ম পূরণ করেছে যে নিজের নামের বানান আর কখনও ভুল হয় না। বাবার নাম, জন্মতারিখ, জাতীয়তা, দৃশ্যমান পরিচয়চিহ্ন—সব সে মুখস্থ বলতে পারে। শুধু ‘পেশা’ লিখতে গেলেই হাত থেমে যায়।
সে চারটে ছেলেমেয়েকে পড়ায়। মাসে পাঁ চ হাজার টাকা হয়। তার মা বলতেন,
“টিউশনিও তো কাজ।”
অরিন্দম বলত,
“কাজ নয়, আপাতত করছি।”
যেন কাজকে কাজ বললে সরকারি চাকরিটা অপমানিত হবে।
তিথির সঙ্গে তার সম্পর্ক সাত বছরের। তিথির বয়স সাতাশ। প্রথম দু-বছর সে বলত,
“তুই পারবি।” পরের দু-বছর বলত, “আর একটু চেষ্টা কর।” গত এক বছর ধরে বলেছে,
“বাড়ির লোক আর সময় দেবে না।”
অরিন্দম প্রতিবারই একই উত্তর দিয়েছে—
“এই পরীক্ষাটা হয়ে যাক।”
পরীক্ষাগুলো হয়েছে; অরিন্দম হয়নি।
তিথি একটি নার্সিংহোমের রিসেপশনে কাজ করত। একবার সে বলেছিল,
“আমার বারো হাজার, তোর পাঁচ হাজার—ছোট করে শুরু করা যায়।”
অরিন্দম রেগে গিয়েছিল।
“লোক কী বলবে? বউয়ের টাকায় খাচ্ছি?”
তিথি হেসে বলেছিল,
“লোক তো এখনই অনেক কিছু বলছে। লোকের মুখে কি সরকারি সিল আছে?”
সেই হাসিটা অরিন্দমের খুব খারাপ লেগেছিল।
বিয়ের কার্ডটি এল হোয়াটসঅ্যাপে। তিন দিন পরে বিয়ে। ছেলেটি একটি ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে। সরকারি চাকরি নয়। তিথি এতদিন তাকে বলেছে ‘যেকোনও কাজ কর’, অথচ শেষে একজন বেসরকারি কর্মীকেই বিয়ে করছে—এই তথ্যটিই অরিন্দমকে সবচেয়ে বেশি আহত করল। যুক্তিটা যে উল্টো, সে সেদিন বুঝতে চাইল না।
সেদিন রাতে অরিন্দম ফোনে খবর পড়ছিল। লাল অক্ষরের শিরোনাম, অনেক
বিস্ময়চিহ্ন। প্রাক্তন প্রেমিকা বিয়ে করতে যাচ্ছিল; যুবক তাকে মেরে হবু স্বামীকে ফোনে
জানিয়েছে—‘শেষ’। হবু স্বামী নাকি বাইশ মিনিট ধরে ঝগড়া শুনেছিল। পরে অভিযুক্তও
মারা গেছে।
অরিন্দম খবরটি তিনবার পড়ল। তারপর মন্তব্যগুলো পড়ল।
কেউ লিখেছে, ‘বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি।’ কেউ লিখেছে, ‘সত্যিকারের প্রেমিক হার
মানে না।’ কেউ আবার খুনিকে কাপুরুষ বলেছে। কিন্তু ‘কাপুরুষ’ শব্দটিও অরিন্দমের
কাছে সেদিন প্রশংসার মতো শোনাল।
লোকটি অন্তত কিছু একটা শেষ করেছে।
পাঁচ বছর ধরে অরিন্দম শুধু শুরু করেছে—সিলেবাস, কোচিং, মক টেস্ট, নতুন
খাতা, নতুন প্রতিজ্ঞা। শেষ করতে পারেনি কিছুই। তার হঠাৎ মনে হল, এটাই তার শেষ
পরীক্ষা। এতে বিজ্ঞপ্তি নেই, কাট-অফ নেই, ফল প্রকাশের তারিখও নেই।
শুধু সাহস লাগে।
সে তিথিকে ফোন করল।
“একবার দেখা করবি?”
“এখন?”
“শেষবার। আমার একটা বই তোর কাছে আছে।”
“তিন দিন পরে আমার বিয়ে, অরিন্দম।”
“তাই তো বলছি।”
তিথি কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুরনো পৌর উদ্যানের কথা বলল। সন্ধ্যা সাতটা। অরিন্দম
রান্নাঘরের পুরনো ছুরিটা খবরের কাগজে জড়িয়ে ব্যাগে রাখল। কাগজটির এক পাশে
চাকরির বিজ্ঞাপন, অন্য পাশে বিয়ের পাত্রপাত্রীর কলাম।
উদ্যানে তখন বৃষ্টি থেমেছে। ভেজা বেঞ্চে বসে অরিন্দম মনে মনে একটি বাক্য
অনুশীলন করছিল—
‘তিথি শেষ।’
বাক্যটি তার কাছে সিনেমার সংলাপের মতো লাগল। সে ভাবল, তিথির ফোন থেকে
হবু স্বামীকে কল করবে। নম্বর না পেলে ফেসবুকে খুঁজবে। এই প্রথম কোনও কাজের
পুরো পরিকল্পনা তার মাথায় পরিষ্কার ছিল।
তিথি এল ছাতা নিয়ে। হাতে অরিন্দমের পুরনো সাধারণ জ্ঞানের বই।
“এটা তোরই,” সে বলল। “আমার কাছে ছিল।”
অরিন্দম বই নিল না।
“তুই আমাকে বিক্রি করে দিলি?”
তিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“নিজেকে কে কিনল, আমি এখনও জানি না। ছেলেটার সঙ্গে দুবার কথা হয়েছে।”
“তাহলে বিয়ে করছিস কেন?”
“কারণ বাড়িতে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। কারণ আমার বাবার হার্টের সমস্যা
হয়েছে। কারণ আমার বয়স নিয়ে পাড়া হিসেব রাখে। কারণ তুই প্রতিবার তিন মাস
চেয়েছিস, আর সেই তিন মাসের পিছনে আরও তিন মাস দাঁড়িয়ে ছিল।”
“চাকরি না পাওয়া কি আমার অপরাধ?”
“না,” তিথি বলল। “কিন্তু আমার জীবনকে তোর রেজাল্টের ওয়েটিং লিস্টে রেখে
দেওয়াটা কি খুব ন্যায়?”
অরিন্দমের হাত ব্যাগে ঢুকল।
তিথি বলল,
“আমি তোকে বলেছিলাম, যেকোনও কাজ কর। তুই বলেছিলি সরকারি না হলে
সম্মান নেই। আসলে তুই আমার সঙ্গে সংসার করতে চাসনি। তুই একটা পদমর্যা দার
সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলি।”
অরিন্দম ছুরিটা বের করল। পুরোটা নয়—খবরের কাগজের মোড়ক থেকে শুধু ধাতব
অংশটুকু দেখা গেল।
তিথির মুখ সাদা হয়ে গেল। সে এক পা পিছোল, কিন্তু চিৎকার করল না।
“খবরটা পড়েছিস?” অরিন্দম জিজ্ঞেস করল। “যে মেয়েটা বিয়ে করতে যাচ্ছিল?”
তিথি কিছুক্ষণ ছুরির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ওটা খুনের খবর। প্রেমের নয়।”
“আমাকে সবাই ব্যর্থ ভাবে।”
“তাই আমাকে মারবি?”
“তুই না থাকলে—”
“তোর ব্যর্থতার সাক্ষী থাকবে না?”
তিথির গলা কাঁপছিল, কিন্তু কথাগুলো পরিষ্কার।
“আমাকে মেরে ফেললে তিন দিন সবাই তোকে নিয়ে কথা বলবে। আমার মা
সারাজীবন শুনবে, আমি কেন তোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তোর মা বলবে,
তার ছেলে খারাপ ছিল না। তারপর নতুন একটা খবর আসবে। তোর পাঁ চ বছরের পড়া
আর আমার সাত বছরের অপেক্ষা—সব মিলে এক লাইনের শিরোনাম হবে। নিচে
বিজ্ঞাপন থাকবে—‘সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে আজই ভর্তি হন।’”
অরিন্দম ছুরিটা তুলতে চাইল।
হাত উঠল না।
হঠাৎ সে বুঝল, তিথিকে মারতে আসেনি সে; নিজের জীবনে অন্তত একটি কাজ
‘সম্পূর্ণ’ করতে এসেছে। ভালোবাসা নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিনয়। যে মেয়েটিকে সে
এত বছর ভালোবেসেছে, তাকে মানুষ হিসেবে নয়, নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে
দেখছিল।
ছুরিটি কাদায় পড়ে গেল।
অরিন্দম বেঞ্চে বসে পড়ল।
“চাকরি পাইনি। তোকে রাখতে পারিনি। এখন তোকে মারতেও পারলাম না। আমি
ব্যর্থ। সারাজীবন ব্যর্থই থাকব।”
তিথি ফোন বের করল।
“খুন করতে না পারাটা ব্যর্থতা হলে, আজ ব্যর্থই থাক।”
সে তার দাদাকে ফোন করল, তারপর পুলিশে। অরিন্দম পালাল না। ভেজা বেঞ্চে
বসে রইল। তিথিও দূরে দাঁ ড়িয়ে রইল। তাদের মধ্যে কাদায় পড়ে থাকা ছুরিটা যেন সাত
বছরের সমস্ত কথার চেয়ে স্পষ্ট ছিল।
থানায় কনস্টেবল অভিযোগ লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করল,
“পেশা?”
অরিন্দম অভ্যাসমতো বলল,
“বেকার।”
তিথি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ও পড়ায়।”
কনস্টেবল মাথা না তুলেই লিখল—
পেশা: গৃহশিক্ষক।
পাঁচ বছরে প্রথম কোনও সরকারি কাগজ অরিন্দমকে একটি পেশা দিল।
কাগজটি ছিল তার বিরুদ্ধে লেখা অভিযোগ।
লেখকের ঘোষণা: এই সংকলনের গল্পগুলি সাহিত্যকর্ম। কিছু গল্প বাস্তব সংবাদ বা সামাজিক ঘটনার প্রেরণা বহন করলেও চরিত্র, সংলাপ, মানসিক দ্বন্দ্ব ও কাহিনি সাহিত্যিক নির্মাণ। প্রতিটি গল্পের নিজস্ব ঘোষণা বা উৎস-নোট যেখানে আছে, তা মূল পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী রাখা হয়েছে।
এই গল্পগুলিতে আমি নরনারীর মনের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছি—সেই অন্ধকার পাতালে, যেখানে প্রেমের সঙ্গে মালিকানা, নিরাপত্তার সঙ্গে বন্দিত্ব, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অপরাধবোধ এবং যত্নের সঙ্গে অবহেলা একই ঘরে বাস করে। প্রতিটি মানুষই প্রতিদিন এই অনুভূতিগুলিকে ছুঁয়ে যায়; কিন্তু প্রকাশ করতে গেলে ভাষা হারিয়ে ফেলে।
আমি নারীকে দেবী বা দোষী, পুরুষকে অত্যাচারী বা নির্দো ষ—কোনও সহজ নামের মধ্যে আটকে রাখতে চাইনি। সম্পর্কের ভিতরে আমরা একই সঙ্গে আহত এবং আঘাতকারী, প্রেমিক এবং বিচারক, আশ্রয়দাতা এবং কারারক্ষী হয়ে উঠি। এই গল্পগুলি সেই জটিল মানুষের গল্প—যে মানুষ অন্যকে বোঝার আগে নিজেকেই পুরোপুরি বোঝে না।
পাঠক যদি কোনও গল্প পড়ে নিজের জীবনের একটি নীরব প্রশ্নের ভাষা খুঁজে পান, তবে এই দীর্ঘ অর্ঘ পেক্ষার কিছুটা অর্থ থাকবে।
পাঠক-সতর্কীকরণ: কয়েকটি গল্পে আত্মহত্যা, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, মৃত্যু , অপরাধ ও সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রসঙ্গ রয়েছে। সংবেদনশীল পাঠক নিজের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী পড়বেন।